
বিশেষ প্রতিনিধি :
উপশিরোনাম:
#অনিয়ম, ভূয়া বিল, অঘোষিত সাম্রাজ্যের জমিদার।
# সরকারি প্রকল্পে ব্যক্তিগত রাজত্ব।
# তিন স্তরের ফটক, শ্যালকের চাঁদিমহল, কোটি টাকার ডেকোরেশন।
# ক্ষমতার বেপরোয়া প্রদর্শন।
৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকার জলবায়ু সহনীয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ক্ষুদ্র পানি সম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প। প্রায় ৫০০ জন আউটসোর্সিং কর্মী ও কনসালট্যান্ট নিয়ে বিশাল এ প্রকল্পের বর্তমান প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. এনামুল কবিরকে ঘিরে জমেছে ভয়াবহ অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার আর অর্থ লোপাটের অভিযোগ।
এ ব্যাপারে ২৮ অক্টোবর ২৫ তারিখে উপসচিব মোহাম্মদ শামীম বেপারী স্বাক্ষরিত-৪৬.০০.০০০০.০৬৮.৯৯.০৭১.২৪-১০৮৭ নং স্বারকে ৩ দিনের মধ্যে তথ্য প্রদান সংক্রান্ত চিঠি ইস্যু করা হয়েছে।
ঝিনাইদহের কালিগঞ্জ উপজেলার বুযিডাঙ্গা গ্রামের এক নিম্ন আয়ের ফরিয়া ব্যবসায়ীর পরিবারে জন্ম এনামুলের। বাবা ইছরাইল হোসেন সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাতে মহাজনদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিতেন। পাঁচ ভাই এক বোনের পরিবারে এনামুল ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। দুই বড় ভাইয়ের একজন আইএফসিআই ব্যাংকে ম্যানেজার, অপরজন তুলা উন্নয়ন বোর্ডে চাকরি করেন।
তবে পরিবারের এই সাধারণ আর্থিক অবস্থা একসময় বদলে যায়। এনামুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, চাকরি জীবনের শুরু থেকেই অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থলোভী কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদের পাহাড়। এলাকার ভাষায়, তিনি এখন “নতুন জমিদার”।
# আগের পোস্টিংয়েও অভিযোগের ছড়াছড়ি:
সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে এনামুলের বিরুদ্ধে আসে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ। পরে ওয়াহিদুর রহমান এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী থাকাকালে এনামুল কবির ছিলেন তার স্টাফ অফিসার। সেই সময়ও অনিয়ম, ভুয়া বিল আর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
২০২৩–২৪ অর্থবছরে শুরু হওয়া প্রকল্পে এনামুলের উত্থান
প্রকল্পটি চালু হয় ২০২৩ ও ২০২৪ অর্থবছরে। প্রথম পিডি ছিলেন শেখ নূরুল ইসলাম। তিনি পদোন্নতি পেয়ে বরিশালে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার পর প্রকল্প পরিচালক হন এনামুল কবির। দায়িত্ব পাওয়া মাত্র তিনি যেন পুরো প্রকল্পটিকেই ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যে পরিণত করতে শুরু করেন।
কর্মী নিয়োগে অর্ধশতাধিক স্বজন, মাথাপিছু ৩–৫ লাখ ঘুষ
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আউটসোর্সিং ও কনসালট্যান্ট নিয়োগে প্রতিটি পদে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে। নিয়োগ পাওয়া লোকজনের মধ্যে এনামুলের আত্মীয়–স্বজন রয়েছে অর্ধশতাধিক।
এলজিইডির বিশাল ভবন ফেলে শেওড়াপাড়ায় ব্যয়বহুল অফিস
এনামুলের সবচেয়ে আলোচিত কাজগুলোর একটি হলো রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় আগোরা ভবনে প্রকল্পের জন্য নতুন অফিস ভাড়া নেওয়া।
এলজিইডির নিজস্ব বড় ভবন থাকা সত্ত্বেও কেন তিনি পৃথক অফিস ভাড়া নিলেন, সে বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী কিংবা মন্ত্রণালয়ের কাউকেই তিনি কিছু জানাননি।
ভাড়া দেখানো হয়েছে কমার্শিয়াল স্পেস হিসেবে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে তিন গুণ বেশি।
অফিস ডেকোরেশন করানো হয়েছে রাজকীয় স্টাইলে। ভুয়া বিল–ভাউচার দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে তার বিরেুদ্ধে।
শত শত কোটি টাকার সম্পদ, ভাইয়ের নামে লেনদেন
সূত্র বলছে, এনামুল তার বড় ভাইয়ের মাধ্যমে সব অর্থ লেনদেন করেন। দুই ভাই মিলে এলাকায় কিনে ফেলেছেন শত শত বিঘা জমি। গ্রামের বাড়িতে নির্মাণ করেছেন রাজকীয় ডুপ্লেক্স ভবন। ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে যাতায়াত করেন হেলিকপ্টারে করে।
প্রশ্ন একটাই:
একজন ফরিয়া ব্যবসায়ীর ছেলের এত সম্পদের উৎস কোথায়?
অফিসে শ্যালকের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’, রাতভর আড্ডা
অফিস ব্যবস্থাপনা, কেনাকাটা, রক্ষণাবেক্ষণ—সবকিছুর দায়িত্বে রয়েছে এনামুলের শ্যালক ফরিদ। তিনি সার্বক্ষণিক অফিসে অবস্থান করেন, যদিও তিনি প্রকল্পের কোনো কর্মকর্তা নন।
অভিযোগ আছে, সন্ধ্যার পর ফরিদ বহিরাগতদের নিয়ে রাতভর আড্ডা দেন। শ্যালকের জন্য রয়েছে আলাদা কক্ষও। বিধি লঙ্ঘনের সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তিন স্তরের নিরাপত্তা ফটক, পিডির কাছে পৌঁছানোই কঠিন
ঠিকাদার, সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক— কারও পক্ষে এনামুল কবিরের সঙ্গে সহজে দেখা করা সম্ভব নয়।
অফিসে রয়েছে তিন স্তরের নিরাপত্তা ফটক। প্রবেশাধিকার শুধুই এনামুলের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল।
সিকিউরিটি স্টাফদের আচরণ স্থানীয় ভাষায় বলতে গেলে একেবারে ‘মাস্তানসুলভ’, যার কারণে কেউ প্রকল্প অফিসে যেতে চান না।
অনেকে মন্তব্য করছেন, এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে দেখা করতেও এত ভিআইপি ঝামেলা নেই। এনামুলের আচরণ দেখে মনে হয় যেন তিনি মন্ত্রণালয়ের সচিব বা মন্ত্রী।
মন্ত্রণালয়ের শোকজ… ঘনিয়ে আসছে তদন্ত
এনামুলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়েও পৌঁছে গেছে।
দুই কোটি টাকা ব্যয়ে বিলাসবহুল অফিস সাজানো এবং নিয়ম ভেঙে জনবল নিয়োগের বিষয়ে তাকে শোকজ করা হয়েছে। কার অনুমতিতে এসব করেছেন, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে মন্ত্রনালয়।
প্রতিবেদকের প্রশ্নে ‘মাস্তানি’, দেখে নেওয়ার হুমকি
অভিযোগ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে সাংবাদিকের সঙ্গে পিডি এনামুল কবির আচরণ করেন চরম অসৌজন্যমূলকভাবে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নন। এমনকি প্রতিবেদককে ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকিও দেন।